টরন্টোতে মুসলিম সার্কেল অব কানাডার ন্যাশনাল কনভেনশন অনুষ্ঠিত:
ইসলামী জ্ঞানচর্চা, নেতৃত্ব বিকাশ ও পারিবারিক বন্ধন জোরদারের আহ্বান!
টরন্টো, কানাডা: ইসলামী জ্ঞানচর্চা, দাওয়াহ, নেতৃত্বের বিকাশ, তরুণ প্রজন্মের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে কানাডার অন্যতম বৃহৎ ইসলামিক সংগঠন মুসলিম সার্কেল অব কানাডা (MCC)-এর ন্যাশনাল কনভেনশন ২০২৬ টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। টরন্টোর ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব টরন্টো (IIT)-এ দিনব্যাপী আয়োজিত এ কনভেনশনে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আগত শত শত পরিবার, আলেম, কমিউনিটি নেতা, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী এবং তরুণ-তরুণীরা অংশ নেন। প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ, সমৃদ্ধ আলোচনা এবং পারিবারিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ কনভেনশন মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
কনভেনশনে সভাপতিত্ব করেন মুসলিম সার্কেল অব কানাডার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ব্রাদার শাহীন সিদ্দিকী। পুরো অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ব্রাদার আহসানুল করিম সোহাগ। উদ্বোধনী বক্তব্যে সংগঠনের নেতারা বলেন, বর্তমান সময়ে মুসলিম সমাজের সামনে নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জ্ঞানচর্চা, সুদৃঢ় নেতৃত্ব, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা আরও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।
কনভেনশনে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান ইসলামিক স্কলার, দাঈ ও কমিউনিটি নেতারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ ও কমিউনিটি নেতা হামিদ হোসাইন আজাদ, অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মনিরুজ্জামান, মুসলিম উম্মাহ অব নর্থ আমেরিকা (মুনা)-এর চেয়ারম্যান মাওলানা দেলোয়ার হুসেন, শায়েখ মুসলেহ খান, শায়েখ ইউসুফ বাদাত এবং শায়েখ আবু নোমান তারেক।
তাঁদের আলোচনায় ব্যক্তি ও সমাজ গঠনে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবনব্যবস্থার গুরুত্ব, ইসলামী নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উপায়, যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ, দাওয়াহ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে মুসলিমদের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়। বক্তারা বলেন, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি আদর্শ সমাজ গঠন, মানবকল্যাণে কাজ করা এবং আগামী প্রজন্মকে সঠিক আদর্শে গড়ে তোলাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
কনভেনশনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টরন্টো সিটির মেয়র অলিভিয়া চো। তিনি তাঁর বক্তব্যে কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে মুসলিম কমিউনিটির ইতিবাচক অবদানের প্রশংসা করেনতিনি মুসলিম সার্কেল অব কানাডার এমন উদ্যোগকে সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, সমাজসেবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও অংশ নেন। তাঁদের উপস্থিতি কনভেনশনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
তরুণ প্রজন্মকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বিশেষ ইয়ুথ কনফারেন্স ছিল এবারের কনভেনশনের অন্যতম আকর্ষণ। সেখানে মুসলিম তরুণদের পরিচয় সংকট, নৈতিক নেতৃত্ব, শিক্ষা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা তরুণদের আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান।
কনভেনশনের সাংস্কৃতিক পর্বও দর্শকদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামিক শিল্পী সাইফুল্লাহ মানসুর তাঁর হৃদয়স্পর্শী নাশিদ পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করেন। এছাড়া বিশ্বখ্যাত নাশিদ শিল্পী মারইয়াম মাসুদ ও ফাতেমা মাসুদ তাঁদের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রা যোগ করেন। আধ্যাত্মিক আবহে পরিবেশিত এসব নাশিদ উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে গভীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে।
সম্মেলনের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী পর্ব ছিল Maskwa David Alexanderson, Community Relations Officer, Justice for All Canada-এর জীবনকাহিনি। সাস্কাচুয়ানের একটি আদিবাসী (Indigenous) পরিবারে জন্ম নিয়ে জীবনের নানা অন্ধকার অধ্যায় অতিক্রম করে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া এবং আজ একজন দায়ী হিসেবে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার তাঁর অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে।
মূল অনুষ্ঠান ছাড়াও কনভেনশন প্রাঙ্গণে ছিল ইসলামিক বই, পোশাক ও শিক্ষা-উপকরণের বিভিন্ন স্টল, কমিউনিটি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রদর্শনী, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সচেতনতামূলক বুথ, বৈচিত্র্যময় ফুড কোর্ট এবং শিশুদের জন্য বাউন্সি ক্যাসলসহ বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা। ফলে ধর্মীয়, শিক্ষামূলক ও সামাজিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পুরো অনুষ্ঠানটি পরিবারকেন্দ্রিক এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় রূপ নেয়।
অংশগ্রহণকারীরা জানান, এমন আয়োজন শুধু ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগই সৃষ্টি করে না; বরং বিভিন্ন প্রদেশে বসবাসরত মুসলিমদের মধ্যে পরিচিতি, পারস্পরিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং কমিউনিটি নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করে।
আয়োজকদের মতে, মুসলিম সার্কেল অব কানাডার ন্যাশনাল কনভেনশন কেবল একটি বার্ষিক সম্মেলন নয়; এটি কানাডায় বসবাসরত মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ইসলামী জ্ঞানচর্চা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, পারিবারিক মূল্যবোধ, আন্তঃপ্রজন্মের সংযোগ এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁরা জানান, অংশগ্রহণকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, উৎসাহ এবং সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে এবারের কনভেনশন অত্যন্ত সফল ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভবিষ্যতেও মুসলিম কমিউনিটির ঐক্য, শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।









Send a Comment
Your comment will be sent privately to the MCC Newsletter team and will not be published on the website.