মুহাররম
আরবি হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মুহাররম, যা ‘সম্মানিত’ মাস হিসেবে পরিচিত। এটি কেবল নতুন বছরের শুরুই নয়, বরং সত্য, ন্যায় ও আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল একটি মাস।
মুহাররমের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
শাহাদাতে কারবালা
এই মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরার দিনে কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) সপরিবারে শহীদ হন। অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তিনি।
অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে এই দিনেই হযরত নূহ (আ.)-এর প্লাবন থেকে মুক্তি, হযরত মুসা (আ.)-এর ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার এবং হযরত ইউনুস (আ.)-এর মাছের পেট থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো বহু বরকতময় ঘটনা ঘটেছে।
মুহাররমের শিক্ষা
অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
কারবালার মূল শিক্ষা হলো, যতই শক্তিশালী হোক না কেন, অন্যায়ের কাছে কখনও আপস করা যাবে না।
আত্মত্যাগ ও আদর্শের বিজয়
ইমাম হুসাইন (রা.) নিজের ও পরিবারের জীবন বিসর্জন দিয়েও আদর্শ ও ন্যায়ের পথ আঁকড়ে ধরেছিলেন। এটি প্রমাণ করে, সাময়িক পরাজয় হলেও আদর্শের মৃত্যু হয় না।
ধৈর্য ও ইবাদত
মুহাররম মাসে নফল রোজা রাখা এবং বেশি বেশি ইবাদত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। মুহাররম আমাদের অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার শিক্ষাই প্রদান করে। এ মাসের শিক্ষাকে ধারণ করে ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার পথে চলাই প্রকৃত মুহাররমের সার্থকতা।
মুহাররমের ফজিলত ও রোজা সংক্রান্ত প্রধান হাদিসসমূহ
সর্বোত্তম রোজা
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “রমজানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা।” (সহিহ মুসলিম)
আশুরার রোজার ফজিলত
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনের রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা আগের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম)
মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতা
অন্য হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা মুহাররমের ১০ তারিখে রোজা রাখছে। কারণ, এই দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন নবীজি (সা.) বলেন, “মুসার (আ.) ওপর আমাদের অধিকার তাদের চেয়ে বেশি।” তাই তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি)
আশুরায় বর্জনীয়
- হজরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে কাল্পনিক তাজিয়া বা নকল কবর বানানো থেকে বিরত থাকা।
- তাজিয়া বানিয়ে তা কাঁধে বা যানবাহনে বহন করে মিছিলসহ সড়ক প্রদক্ষিণ করা থেকে বিরত থাকা।
- নকল তাজিয়ার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাজিয়া বা নকল কবরে নজরানা স্বরূপ অর্থ দান করা থেকে বিরত থাকা।
- নিজেদের দেহে আঘাত করা থেকে বিরত থাকা।
- শোক বা মাতম করা থেকে বিরত থাকা।
- যুদ্ধ সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে ঘোড়া নিয়ে প্রদর্শনী করা থেকে বিরত থাকা।
- ‘হায় হুসাইন’, ‘হায় আলি’ ইত্যাদি বলে বিলাপ, মাতম, মর্সিয়া বা শোকগাঁথা প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা।
- ফুল দিয়ে সাজানো নকল তাজিয়া বা কবরের বাদ্যযন্ত্রের তালে প্রদর্শনী করা থেকে বিরত থাকা।
- হজরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর নামে ছোট বাচ্চাদের দিয়ে ভিক্ষা করানো এবং এ ধরনের কুপ্রথাকে সওয়াব বা বরকতের মাধ্যম মনে করা থেকে বিরত থাকা।
- আশুরায় শোক প্রকাশের জন্য নির্ধারিত কালো বা সবুজ রঙের বিশেষ পোশাক পরাকে ধর্মীয় আবশ্যকতা মনে করা থেকে বিরত থাকা।
Send a Comment
Your comment will be sent to the MCC Newsletter team by email. The team may reply to you directly if needed.