হজ বিশ্বমুসলিম ভ্রাতৃত্বের মহামিলন
ড. মুহা: বিলাল হুসাইন
হজ ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ইবাদতের অন্যতম একটি বুনিয়াদ, যার মাধ্যমে গোটা মুসলিমবিশ্ব এক পতাকাতলে প্রবেশ করতে সবচেয়ে বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। হজ আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ সঙ্কল্প বা ইচ্ছা করা। একজন মুসলমানকে আর্থিক সঙ্গতিসাপেক্ষে আল্লাহর কাছাকাছি যাওয়ার লক্ষ্যে, ইসলামের সুমহান বুনিয়াদ আদায়ের চেষ্টাকে সামনে রেখে বিশ্বভ্রাতৃত্বের মহামিলন বা সেতুবন্ধ বিনির্মাণে কাবাঘর জিয়ারত খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এটি এমন একটি বুনিয়াদ যা সবার ওপর ফরজ নয়। হজরত ইবরাহিম (আ) থেকে শুরু করে হজের এই রীতি যুগ যুগ ধরে চলমান। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ) পৃথিবীর মানুষকে আহ্বান করেছিলেন কাবাঘরে এসে হজ আদায় করতে। আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়টি কুরআন মজিদে এভাবে বর্ণনা করেছেন, “মানুষের নিকট হজের ঘোষণা করে দাও, তা হলে তারা পদব্রজে এবং সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রের পিঠে চড়ে পৃথিবীর দূর-দূরান্তর থেকে আসতে থাকবে। এখানে এসে তারা দেখতে পাবে তাদের জন্য কত লাভের ব্যবস্থা রয়েছে। আর তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নামে কোরবানি করবে। তা থেকে নিজেরাও খাবে এবং দুস্থ ও অভাবগ্রস্তকেও খেতে দেবে।” (সূরাহ হজ: ২৭-২৮)
পৃথিবীর প্রথম ঘর মসজিদুল হারাম বা কাবাঘর। সে কথা পবিত্র কুরআন মজিদেও পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, “নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা জনগণের জন্য নির্মিত হয়েছে, তা হলো মক্কার কাবাঘর যা অত্যন্ত পবিত্র, বরকতময় ও বিশ্ববাসীর জন্য পথপ্রদর্শকের কাজ করে।” (সূরাহ আলে ইমরান: ৯৬)
সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, হজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদ। হজের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আত্মশুদ্ধি এবং পাপমুক্ত হয়ে নিরহঙ্কার জীবন যাপন করা। তাই আকার, আকৃতি, প্রকৃতি, পেশা, বর্ণ, ভাষায় পার্থক্য সত্ত্বেও সব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলপ্রেমিক হাজীদের মধ্যে অভিন্ন চেতনা লক্ষণীয়। কারো মধ্যে নেই হিংসা বিদ্বেষ, আভিজাত্যের অহঙ্কার। আমিত্ব ও স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে হজের সময় প্রাচ্য-প্রতীচ্যের অগণিত মুসলমান মক্কায় সমবেত হন।
হজ বিশ্বভ্রাতৃত্বের অন্যতম মিলনমেলা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন বর্ণের, বিভিন্ন আকৃতির, বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন বয়সের মানুষ একত্রিত হয়ে যখন আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করে এবং সুবিশাল আরাফাত ময়দানে লক্ষ লক্ষ সম্মানিত হাজী সাহেব সমবেত হয়ে একাত্মতা ঘোষণা করেন, তখন মুসলিম ভ্রাতৃত্বের পূর্ণরূপ প্রকাশিত হয়।
হজ সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের জন্য এক বড় নিয়ামত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে আল্লাহর উদ্দেশে ওই ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।” (সূরাহ আলে ইমরান: ৯৭)
হজের মাধ্যমে বিশ্বমুসলিমরা তাওহিদি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী আইনকানুন মেনে চলার শপথ নেয়। আল্লাহর বাণীর ধারকবাহক হন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা আল্লাহর রজ্জু একত্রিত হয়ে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর আর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)
হজের মাধ্যমে বিশ্বমুসলিমের মধ্যে সংঘাত, অশান্তির পরিবর্তে সৌভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, শৃঙ্খল, ঐক্য সংহতি প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করছি।