হজ প্রবর্তক হযরত ইব্রাহীম (আ) ও বিবি হাজেরা সকল পিতা-মাতার জন্য অনুপম দৃষ্টান্ত
ইব্রাহীম (আ), বিবি হাজেরা এবং ইসমাঈল (আ)-এর ঘটনা থেকে ঈমান, ত্যাগ, ধৈর্য ও সন্তান গঠনের শিক্ষা।

মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আ) ও তদীয় স্ত্রী বিবি হাজের মুসলিম ইহুদি- খ্রিস্টানসহ সমগ্র বিশ্বের পিতামাতার জন্য এক অত্যুজ্জ্বল, অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রতিটি পিতা-মাতার যদি উনাদের মত ঈমান, আনুগত্য, ত্যাগ, আল্লাহ ভীতি ও ধৈর্য থাকত তবে এই সুন্দর পৃথিবী এত ভয়ঙ্কর, হিংস্র না হয়ে সুষমামন্ডিত ও সুশৃঙ্খল হতে পারত। পৃথিবীর প্রায় সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যেত, প্রকারান্তরে সমস্যার জন্ম হত না। কতিপয় সন্তানের নিকট পিতা-মাতা উপেক্ষিত, নিগৃহীত ও লাঞ্ছিত হতে হত না। কোন সন্তানই পিতা-মাতার মনোবেদনার কারণ না হয়ে বরং দুনিয়ার চক্ষু শীতলকারী, হৃদয় প্রশান্তকারী আখিরাতেও সাফল্যমন্ডিত হয়ে যেত। ধন্য ও সার্থক হত পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের। বর্তমানে প্রাচ্য পাশ্চাত্য, মুসলিম অমুসলিম, ধনী -দরিদ্র সর্বত্রই সন্তানের উচ্ছৃঙ্খলতায় ঘরে ঘরে হাহাকার, অশান্তি, হতাশা এ কষ্ট শুধু পরিবারেই সীমিত নয় বরং সমাজ রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল পর্যন্ত ব্যাপৃত। এ থেকে উত্তরণের কোন বাস্তবসম্মত পন্থা কেউ যেন খুঁজে পাচ্ছেন না।

অথচ হযরত ইব্রাহীম (আ) ও তার স্ত্রী-পুত্রের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা নিয়ে অনুসরণ করলে খুব সহজেই এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ লাভ করা সম্ভবপর হত, ঘরে বাইরে তথা সমগ্র বিশ্বে শান্তির ফল্গুধারা প্রবাহিত হতো। যুব বয়েসে ইব্রাহীম (আ) সত্যিকার অগ্নিকুন্ডের ঈমানী পরীক্ষায় পাস করার পর পিতা-মাতা ও স্বদেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে একাকী পথে প্রান্তরে, দেশে বিদেশে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকলেন। পিতৃত্বের স্বাদ বঞ্চিত হাহাকার হৃদয়ে চরম ধৈর্যের সাথে দীর্ঘকাল কাটানোর পর ৮৬ বছর বয়েসে প্রথম সন্তানের মুখ দেখেন কিন্তু এখানেও দুগ্ধপোষ্য একমাত্র শিশুপুত্রকে যুবতী স্ত্রীসহ জনমানবহীন, তরুলতাবিহীন ধু ধু মরু প্রান্তরে ১০০০ কিলোমিটার দূরবর্তী স্থানে আল্লাহর নির্দেশে রেখে আসেন এলাকাটি আবাদ করার লক্ষ্যে। আল্লাহর নির্দেশে পালন করতে গিয়ে প্রেম-প্রীতি স্নেহ বাৎসল্যের আবেগ দমন করলেও এদের জন্য তাঁর দোয়ার ভাষায় তা ফল্গুধারার মত উচ্ছসিত হয়ে পড়েছে।

তিনি কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে বলেন হে আমাদের রব! আমি একটি তৃণপ্রাণিহীন উপত্যকায় নিজেদের বংশধরদের একটি অংশকে তোমার পবিত্র গৃহের কাছে এনে বসবাস করিয়েছি। পরওয়ারদিগার! এটা আমি এজন্য করেছি যে, এরা এখানে নামায কায়েম করবে। কাজেই তুমি লোকদের অন্তরে এদের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করে দাও, আর তাদেরকে ফলমূলের রিজিক দান কর, যাতে করে তারা তোমার শুকরিয়া আদায় করতে থাকে।' (সূরা ইব্রাহীম: ৩৭)

কি প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা। চিন্তা করা যায়? এই মহামানবের দোয়ার মধ্যে সুস্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এরা ধ্বংস হয়ে যাবে কিনা সে ব্যাপারে কোন উৎকণ্ঠা বা ভয়ভীতি নয় বরং তাদের জন্য দোয়া করেছেন এই বলে এরা যেন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েতকারী, নামায প্রতিষ্ঠাকারী ও শোকরকারী হয়। তিনি প্রাণ খুলে ফলসহ রিজিকের জন্য দোয়া করার ফলে অনুর্বর মক্কা নগরীতে বিগত চার হাজার বছর ধরে লাখ লাখ হাজী সাহেবানসহ সেখানকার বাসিন্দাদের ফল ও রিজিকের সমস্যা হয় না। সূরা কুরাইশের মধ্যে আল্লাহপাক কুরাইশের শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন ব্যবসা ও নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করেছেন ।

ওনার দোয়ার স্ত্রী সন্তান যেন নামায কায়েমকারী তথা দ্বীন প্রতিষ্ঠাকারী ও শোকরকারী হয় এবং এমন গুণাবলী যেন অর্জন করে পরিণতিতে লোকজনও তাদের ভালবাসে শ্রদ্ধা করে। আমরা কি আমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের ও সমস্ত গুণাবলী অর্জনের জন্য আন্তরিক চেষ্টা করি, যতটা করে থাকি দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠত করার জন্য?

বিশ্বনেতার উপযুক্ত স্ত্রী বিবি হাজেরার স্বামী ফিরে চলে যাওয়ার সময় সজল চোখে জানতে চাইলেন, কার নির্দেশে আমাদের একাকী রেখে যাচ্ছেন উত্তরে স্বামী জানালেন, আল্লাহর নির্দেশে। আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থাশীল মহীয়সী নারী পরম নিশ্চিন্তে তখন বলে উঠলেন, আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না। আপনি নিশ্চিন্তে ফিরে যান । পরবর্তী অবস্থা সকলেই জানেন, খাদ্য ফুরিয়ে গিয়ে মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে যায়। অসহায় মা শিশুর প্রাণ রক্ষার্থে পানির আশায় কোন কাফেলা পাওয়া যায় কিনা এ আশায় ৭ বার নিকটবর্তী সাফা-মারওয়া পাহাড়ে আকুল হয়ে ছুটাছুটি করেন । অলৌকিক পন্থায় জমজমকূপ সৃষ্টি হয়। অতঃপর জমজমের পানিকে কেন্দ্র করে সেখানে বসতি গড়ে উঠে। ইব্রাহীম (আ.) মাঝে মাঝে এসে স্ত্রী পুত্রকে দেখে যেতেন। পিতা মাতা মিলে সন্তানকে আদর্শ সন্তান হিসাবে গড়ে তোলেন। এবার এলো আরও কঠিন পরীক্ষা পিতার হাতে পুত্রকে উৎসর্গ (কুরবানি) করার নির্দেশ। পিতা পুত্রের সহযোগিতা কামনা করলেন, খুল বললেন এ কঠোর সিদ্ধান্তের কথা।

পুত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাথা পেতে দিলেন। বললেন হে আমার পিতা, আপনি যে বিষয় আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করে যান, আল্লাহর ইচ্ছাই আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন (সূরা সাফফাত-১০২)

,

সেদিন ৯৯ বছরের বৃদ্ধের একমাত্র কিশোর সন্তানকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করে দেয়া বা নিজের হাতে জবাই করে দেয়ার এ ঘটনা আসমান জমিনের সকল অধিবাসী সবিস্ময়ে দেখল জানল। ফেরেস্তারগণ বুঝি বা লজ্জা পেয়েছিল, মানব সৃষ্টির বিরোধিতা করায়। তাদের এই অবিস্মরণীয় ত্যাগের ফলে আল্লাহ খুশি হয়ে যান ইসমাঈলের পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানি হয়ে গিয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন “যখন পিতা ও পুত্র উভয়েই (আমার আদেশের প্রতি) পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করল, আর পিতা তার পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল (এবং ছুরি চালাতে আরম্ভ করল) তখন আমি তাকে এ বলে ডাক দিলাম যে, হে ইব্রাহীম, তুমি স্বপ্ন সত্যিই বাস্তবায়ন করে দেখালে। নিঃসন্দেহে ইহা এক মহান পরীক্ষা আর তাকে ((ইসমাঈলকে) আমি একটি মহামূল্যবান পশুর বিনিময়ে মুক্ত করে দিলাম।” (সূরা সাফফাত-১০৩-১০৭) আল্লাহর অপর এক নির্দেশে পিতা পুত্র মিলে কাবাঘর নির্মাণ শুরু করলেন।

পুত্র পাথর -সুরকি বা মাল মসলা এগিয়ে দিচ্ছেন পিতা গাঁথুনি গাঁথছেন আর দোয়া করেছেন, এই বলে “হে প্রভু, আমাদের উভয় (পিতা পুত্র) কে তোমার প্রতি আত্মসমর্পণকারী মুসলিম উম্মাহ (আত্মসমর্পণকারী দল) সৃষ্টি কর, আর আমাদের শিক্ষা দাও ইবাদতের (হজের রীতিনীতি) পন্থা। আমাদের দোষত্রুটি ক্ষমা কর, তুমিই তো ক্ষমাশীল অনুগ্রহকারী” (বাকারা ১২৮)। ইব্রাহীম (আ.) এ সময় পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে নিয়ে আরও দোয়া করেন “হে প্রভু এদের মধ্যে স্বয়ং এদের জাতির মধ্য হতে এমন একজন রাসূল পাঠাও যিনি এদেরকে তোমার আয়াতসমূহ পড়ে শুনাবেন। তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের বাস্তবজীবনকে পরিশুদ্ধ ও সুষ্ঠুরূপে গড়ে তুলবেন” (বাকারা ১২৯) তাদের এই দোয়ার ফলশ্রুতিতে ইসমাঈল (আ.) এর বংশে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে । তাদের নির্মিত কাবাঘরটি মুসলিম জাতির কিবলা। একে কেন্দ্র করে বিগত চার হাজার বছর ধরে হয়ে আসছে।

ইব্রাহীম (আ.) তার পুত্র নিয়ে যে দোয়া করলেন তাতে বলেন, উভয়ে যেন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমপূর্ণকারী হতে পারেন, ইবাদতের পদ্ধতি শিখতে পারেন এবং তাদের ভুলত্রুটিগুলো যেন ক্ষমা করা হয়। পুনরায় উভয়ের বংশ বা জাতি থেকে এমন রাসূল পাঠানোর আবেদন করেন যিনি উপরোক্ত গুণাবলী সম্পন্ন হবেন। সন্তান, ভবিষ্যৎ বংশধর ও সমগ্র মানবতার কল্যাণের জন্য এভাবে প্রাণ খুলে প্রত্যেক পিতামাতার দোয়া করা উচিত, দোয়াতে কার্পণ্য করা ঠিক নয়। অনত্র ইব্রাহীম (আ.) দোয়া করেছেন এই বলে, “আমার ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচাও। হে আমার রব এ মূর্তিপুজা অনেককে ভ্রষ্টতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” (সূরা ইব্রাহীম: ৩৫-৩৬)। সন্তানদের শিরক বা মূর্তিপ্রীতি থেকে বাঁচাতে হবে।

মাতা পিতা সন্তানকে শুধু স্নেহ-মমতাই নয় বরং সত্যিকার আল্লাহপ্রীতি ও আত্মসমর্পণকারী তথা একনিষ্ঠ মুসলিম হিসাবে গড়ে তোলাই মুসলিম পিতামাতার মূল দায়িত্ব। হযরত মুহাম্মদ (সা) তার ছোট কন্যা মা ফাতিমা (রা) কে অত্যন্ত ভালবাসতেন। রাসূল (সা) ফাতিমাকে না দেখে কোন সফর বা যুদ্ধে যেতেন না, ফিরে এসে প্রথমেই কন্যার সাথে দেখা করতেন। বেহেস্তে মহিলাদের সরদার এই কন্যাই পিতা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান থাকা অবস্থায় ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বেঁধে রেখেছেন। গমের চাকতি ঘুরাতে ঘুরাতে উনার হাতে দাগ পড়ে গিয়েছিল। একবার পিতার কাছে দাসীর জন্য আবেদন করলে এখনও আহলে সুফফাদের সমস্যার সমাধা হয়নি, বলে কন্যাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন। হযরত ওমর (রা) আমীরুল মুমেনিন থাকা অবস্থায় তার পুত্র ঈদের দিন ১৪ টি তালি বিশিষ্ট জামা পরিধান করতে বাধ্য হয়েছেন। হযরত ওমর (রা) এর পিতা খাত্তাব ওমরকে কঠোর ও কঠিন প্রশিক্ষণ দিয়ে বড় করে তুলেছেন। মহিলা সাহাবী কবি খানসা তার চার ছেলেকে নিজ হাতে পোশাক পরিয়ে জিহাদে পাঠিয়ে দিলেন।

৪ জন পুত্ৰ শহীদ হয়ে গেলে মা নিজেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইরের মা ৯০ বছর বয়েসে ছেলেকে বর্ম পরিধান না করেই জিহাদে যাওয়ার পরামার্শ দেন। আবদুল্লাহ শহীদ হলে জালেম গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার লাশ গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখেন। নবতিপর অন্ধ মা সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, “এই সওয়ারির ঘোড়া থেকে নামার সময় কি এখনও হয়নি?” বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা আলী -ভ্রাততৃদ্বয়কে তাদের মা জেলে গিয়ে দেখা করে কোনভাবেই ইংরেজদের কাছে মাতা নত বা কম্প্রোমাইজ না করার নির্দেশ দিয়ে আসেন । ফিলিস্তিন ও আফগানের মায়েরা পুত্রদের শহীদ হওয়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ করেন। কুরআনে বহু স্থানে সন্তানকে নসিহত সম্পর্কে উল্লেখ আছে। বিজ্ঞ হেকিম হযরত লোকমান (আ) তার পুত্রদের নসিহত করে যে কথাগুলো বলেছেন তা সূরা লোকমানের ২য় রুকুতে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে । এর মধ্যে অন্যতম হল “হে পুত্ৰ নামায কায়েম কর, সৎ কাজের আদেশ কর, খারাপ কাজ থেকে নিষেধ কর।

আর যে বিপদই আসুক না কেন, সেজন্য ধৈর্য ধারণ কর এ কথাগুলো এমন যে বিষয়ে খুব তাগিদ করা হয়েছে। অহংকার করে মানুষকে অবজ্ঞা করো না; পৃথিবীতে ঔদ্ধত্বের সাথে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না । চলাফেরায় মদ্ধপন্থা অবলম্বন করো। এবং কণ্ঠস্বর নিচু (সংযত) করো।” (সূরা লোকমান : ১৭-১৯) নবী হযরত ইয়াকুব (আ.) এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি সন্তানদের ডেকে কথা আদায় করে নিলেন সন্তানরা আল্লাহর পথে থাকবে কিনা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন “আমার (মৃত্যুর) পর তোমরা কার ইবাদত করবে? তারা সকলেই বলেছিল, আমরা সেই আল্লাহর ইবাদত করব যিনি ছিলেন আপনার মাবুদ এবং আপনার পূর্বপুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকেরও মাবুদ আর আমরা তারই অনুগত মুসলমান হয়ে থাকব।” (সূরা বাকারা : ১৩৩)

ইব্রাহীম (আ.) ও ইয়াকুব (আ.) তার সন্তানদের কি বলেছিলেন দেখুন “এ অসিয়ত করেছেন ইব্রাহীম (আ.) তার সন্তানদেরকে এবং ইয়াকুবও। (তারা বলেছিলেন যে) ‘হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চই আল্লাহর তোমাদের জন্য একটি দ্বীন বাছাই করে নিয়েছেন। কাজেই তোমরা আমৃত্য মুসলমান হয়ে থেকো”। (বাকারা : ১৩২)

,

সকল পিতামাতা কি তাদের মত সন্তানদের মুসলিম বা - আত্মসমর্পণকারী হয়ে থাকার জন্য চেষ্টা করে বা অসিয়ত করে? ইদানীং পিতামাতা সন্তানদের ভালবাসা ও স্নেহ-বাৎসল্যের আতিশয্যে ন্যায় -অন্যায়, হারাম হালাল, পাপ-পুণ্য এবং সার্বিক দায়িত্ব কর্তব্য থেকে পিতা মাতা ওর সন্তান উভয়েই বিচ্যুত হয়ে বহু দূর সরে পড়েছে। স্বামী -স্ত্রী পরস্পরকে ও সন্তানদেরকে খুশি করার জন্য বৈধ-অবৈধ পন্থায় রোজগার করেছেন। দামি কাপড়-চোপড়, বিলাস সামগ্রী, বাড়ি- গাড়ি কিনে দিচ্ছেন। স্ত্রী-কন্যা সেজেগুজে পরপুরুষদের দেখাচ্ছে, পুত্রগণ বেগানা মেয়েদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করেছে, দুষ্ট বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মিশে মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকান্ড জড়িয়ে যাচ্ছে, মা বাবার কথা শুনেছে না, ঘরে ঘরে পাপ ও অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। ফলে পিতামাতা শুধু দুনিয়াতেই কষ্ট পাচ্ছেন এমন নয় পরকালও বরবাদ করে চলেছেন।

মা বাবারা সন্তানের ৩/৪ বছর বয়স হতেই কিন্ডার-গার্টেন থেকে শুরু করে উচ্চ লেভেল পড়ানো এবং দুনিয়ার সুপ্রতিষ্ঠিত ও সফলতার জন্য যে সাধনা, শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় করেন হয় তার এক দশমাংশও কি নামায রোজা ঈমান -আকিদা, আদব -কায়দা মুসলিমের দায়িত্ব -কর্তব্য শেখানো তথা পরকালীন সফলতার জন্য চেষ্টা? ক্ষণস্থায়ী আবাসে এতকিছু প্রয়োজন হলে স্থায়ী আবাসের জন্য কি কিছুরই প্রয়োজন হবে না? এতে প্রকারান্তরের পরকালের অস্বীকার করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে কুরআন হাদীসে কি বলেছে,ভাল করে অর্থ -ব্যাখ্যাসহ পড়ে দেখা উচিত । স্নেহের কলিজার টুকরা সন্তানদের দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ করে দেয়া স্বেচ্ছায় পরিবারের সদস্যদের জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা কোন বুদ্ধিমান ঈমানদার পিতা-মাতার কাজ হতে পারে না। পরিবার সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেছেন, “হে ঈমানদার লোকেরা, নিজেকে ও স্বীয় পরিবারবর্গকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন (জ্বালানি) হবে মানুষ ও পাথর” ।

(সূরা তাহরিম : ৬) অনত্র বলা হয়েছে, “আপনার পরিবারবর্গেকে নামাযের নির্দেশ দেন এবং আপনি নিজেও তার ওপর কায়েম থাকবেন”। (আল কুরআন) সকল পিতামাতাই কি নিজে নামায পড়েন এবং সন্তানদের নামায পড়তে বলেন? ৭ বছর বয়স থেকেই নামায পড়ার অভ্যাস করানো এবং ১০ বছর বয়সে নামায পড়তে না চাইলে শাস্তি দিতে রাসূল (সা) বলেছেন ।

স্বামী -স্ত্রী সন্তান পরীক্ষার বস্তু এদের ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকা দররকার । আল্লাহ বলেন,“তোমরা জেনে রাখ তোমাদের ধন-সম্পদ প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষার সামগ্রী মাত্র” (সূরা আনফল : ২৮)। অর্থাৎ এদের স্নেহ ভালবাসা মহব্বতে পড়ে ঈমানী দায়িত্ব কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয় কাল কেয়ামতে সন্তানরা পিতামাতাকে নিজেদের পদস্থলনের জন্য দায়ী করে আসামি হিসাবে দাঁড় করিয়ে দিবে। রাসূল (সা) বলেন কিয়ামতের দিন বক্তিকে হাজির করা হবে, অতঃপর বলা হবে, এর সন্তান-সন্ততিরা তার সব নেক আমল খেয়ে ফেলেছে। সন্তান পিতামাতার নিকট আমানত, তারা নরম কাদামাটির মতই প্রথমে থাকে, এদের প্রতি অতি স্নেহ বা খামখেয়ালি করলে শেষে শান্তির শ্বেত পায়রা হাত থেকে ফসকে গেলে কিছুই করার থাকবে না। ইব্রাহীম (আ)-এর একার পক্ষে মক্কানগরী আবাদ করা হজের আনুষ্ঠানিকতা প্রবর্তন করা, কিংবা কুরবানি করা কিছুতেই সম্ভব হতো না। যদি তার স্ত্রী ও সন্তান সহায়তা না করতেন।

তিনি তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে যে ধরনের শিক্ষা দিয়েছেন তার প্রতিদান দুনিয়াতে পেয়েছেন, আখিরাতেও পাবেন। সে শিক্ষা থেকে বিশ্ববাসীও উপকৃত হচ্ছেন। চার হাজার বছর ধরে সেই আদর্শেই অনুপ্রাণিত হয়ে হজ ও কুরবানি হচ্ছে। তাই আসুন আমরা আমাদের মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইব্রাহিম (আ) ও বিবি হাজেরার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সন্তান ও পরিবারের প্রতি সঠিক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এ দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তিসহ শিক্ষিত ও আদর্শ বংশধর রেখে যাওয়ার চেষ্টা করি। প্রাণ খুলে স্বামী সন্তানদের জন্য আমরা দোয়া করি, রাব্বানা হাবলানা মিন আজও জিনা ওয়া যুররিয়াতিনা কররাতা আইয়ুনি ওয়া জায়ালনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।” অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক আমাদিগকে আমাদের স্ত্রী (বা স্বামী) ও সন্তান-সন্ততিগণ হতে আমাদের চোখদ্বয়ের শীতলতা দাও এবং আমাদেরকে নেককার লোকদের ইমাম বানাও।' (সূরা ফুরকান :৭৪)।

প্রতি বছর হজের মাস এলে পিতা ইব্রাহীম (আ.) ও বিবি হাজেরা (রা.) এর ত্যাগ, কুরবানি ও সন্তানের প্রতি অবিস্মরণীয় শিক্ষা প্রত্যেক পিতামাতার মনকে উদ্বেলিত করে তোলে এবং দায়িত্ব কতব্য স্মরণ করিয়ে দেয় । মহান আল্লাহপাক প্রত্যেক পিতামাতাকে তাঁদের মত হওয়ার এবং ইসমাঈল (আ.) এর মত অনুগত সন্তান তৈরি করতে পারার যোগ্যতা দিন। প্রত্যেক মুসলিমের ঘরে ঘরে হজ ও কুরবানির অনুপম শিক্ষা বাস্তবায়িত থেকে এ প্রত্যাশা হোক সকলের কাম্য।

-১ ডিসেম্বর ২০০৯