লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক ইন্নাল হামদা ওয়াননিয়ম্মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা শারিকা লাকা।
তৌহিদের চিরন্তন এই শাশ্বত বাণী আর কয়েকদিন পর উচ্চারিত হবে পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল মক্কানগরীর আকাশ-বাতাশ, ধুলাবালি, পাহাড় পাথর থেকে শুরু করে তামাম বিশ্বে। শত কোটি মুসলমানদের কণ্ঠে উচ্চ-অনুচ্চস্বরে ধব্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ইথারে ইথারে। ভেসে বেড়াবে ইনশাআল্লাহ । পৃথিবীর কোথাও, কোন ধর্ম কোন জাতির পক্ষে এমন মহান লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়ে একত্রিত হওয়ার নজির আজ পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেনি কেয়ামত পর্যন্ত পারবেও না ।
হজ ইসলামের ৫টি স্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের উপরেই হজ ফরজ। আল্লাহপাক বলেন, “আল্লাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর হজকর্ম সম্পাদন করা জনগণের উপর এক অবশ্যম্ভাবী কর্তব্য, যে ব্যক্তি এখানে উপস্থিত হওয়ার সামর্থ্য রাখে আর যে ব্যক্তি এ আদেশেকে অস্বীকার করল, (তার জেনে রাখা উচিত যে) আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসী হতে অমুখাপেক্ষী: (আল-ইমরান ৯৭)” যারা ইচ্ছাকৃতভাবে হজ করে না রাসূল (সা) তাদেরকে ইহুদি নাসারার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন “ অনিবার্য প্রয়োজন বা অত্যাচারী শাসক কিংবা কঠিন রোগ যদি হজ পালন হতে কাউকে বিরত না রাখে। আর সে হজ পালন না করেই মৃত্যু বরণ করে, তার মৃত্যু যেন ইহুদি নাসারার মৃত্যু (দায়েমী)” ইসলামের অন্য ৪টি স্তম্ভের ইবাদতগুলো কোনটি মানসিক, কোনটি শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। হজ একজন সচেতন মুসলমানকে অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে থাকে । পরস্পর মিলেমিশে থাকা দলবদ্ধ হয়ে যাতায়াত করা ও একই সাথে রাত্রদিন কাটানো পরস্পর সম্মান করা, উদারতা মহানুভবতা, সাম্য ভ্রাতৃত্ব, ভাবের আদান প্রদান সভ্যতা সংস্কৃতি জ্ঞান- বিজ্ঞান, তাকওয়া শিক্ষা ও প্রতিযোগিতা আরও অনেক কিছু আদান প্রদান ইত্যাদি তো আছেই। সবচেয়ে বড় কথা এতবড় সম্মেলন দেখলে কত বড় কত মহৎ উন্নত জাতি! আত্মগৌরব, আত্মতৃপ্তি, সচেতনতা, ঈমানের মজবুত বৃদ্ধি পাবে যে কারও। মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ) এবং তার স্ত্রী - পুত্রদের অবিস্মরণীয় ত্যাগ ও কুরবানি বিশেষ অনুসরণ রয়েছে হজ প্রথায়। চার হজার পূর্বে আল্লাহর এক প্রিয় বান্দাহ তার হুকুম পালনার্থে বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র পুত্র সন্তানসহ যুবতী স্ত্রীকে জনমানবহীন ধু ধু মরু প্রান্তরে নির্বাসন দেয়া, নিশ্চিন্তমনে স্ত্রীর তা মেনে নেয়া, অতঃপর মা শিশুসন্তানের জীবন রক্ষার্থে পানির আশায় সাফা মারওয়া পাহাড়ে ব্যাকুলভাবে ৭ বার ছুটাছুটি করা, অলৌকিক পন্থায় “ জমজম” কৃপের সৃষ্টি হয়েছে অতঃপর সেই শিশুটি কিশোর বয়সে আল্লাহর রাহে কুরবানির জন্য পিতা পুত্রের মাথা নুইয়ে দেওয়া, পথিমধ্যে শয়তানের তৎপরতা থেকে বাঁচার লক্ষ্যে ৩ বার পাথর নিক্ষেপ করেছে । এ সকল অভাবনীয় দৃশ্যগুলো শুধু স্মরণ করার মাধ্যমে যে কোন বিবেকমান হাজীর তাদের মত কিছুটা হলেও খোদার রঙ্গে রঙিন না হয়ে পারে না। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে নিয়ে আল্লাহর হুকুম আহকামের কাছে মাথা নুইয়ে দিচ্ছি? এভাবে নিজেকে তুলনা করার সুযোগ হজ আমাদের প্রদান করে। চার হাজার বছর পূর্বের একজন অসহায় নারীর আকুল হয়ে ৭ বার দৌড়ানোকে হাজীদের জন্য অবশ্য কর্তব্য করে ইসলাম নারীর যে মর্যাদা দিয়েছে, তা আজও ভাবতে বসলে অবাক হয়ে যেতে হয়। পবিত্র হজের এ এক শিক্ষা বৈকি!
হজ যাত্রীদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলী
ঠান্ডা মাথায় সময় নিয়ে হজের প্রস্ততি নেয়া দরকার। এর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর লিস্ট করে নেওয়া ভাল, কিছু যেন বাদ না পড়ে। হজে যাওয়ার আগে মানুষের টাকা পয়সা বা সম্পদের হক নষ্ট করে থাকলে অথবা কাউকে দৈহিক বা সামাজিক ভাবে কষ্ট দিয়ে থাকলে,তাকে তার ক্ষতিপূরণ দিয়ে ক্ষমা চেয়ে দায় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া উচিত। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন,“ মজলুমের বদদোয়াকে ভয় করবে, কেননা তার মাঝেও আল্লাহর মাঝে কোন অন্তরায় থাকে না” । (বুখারী)
দেনা পাওনা সম্পূর্ণ আদায় করা সম্ভব না হলে একটি তালিকা বা অসিয়তনামা বাড়িতে রেখে যাওয়া উচিত । ঘর বাড়ি দেখা শুনাসহ পোষ্যদের খরচাদির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে যাওয়া উচিত।
জ্ঞানার্জন
হজ শুধু আনুষ্ঠানিকতাই নয় এ এক ফরজ ইবাদত । সুতরাং হজ যাত্রার পূর্বে এ ব্যাপারে ব্যাপক পড়াশুনা করা উচিত। প্রয়োজনীয় মাসালা মাসায়েল জেনে নিতে হবে। ফরজ ওয়াজিব সুন্নত নফল হজের এবং অন্যান্য করণীয় ভালভাবে জেনে বুঝে নিতে হবে। অনেক ফরজ ওয়াজিবের চেয়ে সুন্নত নফল অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে মারাত্মক ভুল করেন । এতে হজ কবুল না হওয়ার সম্ভাবনা থেকে য়ায় । আমাদের দেশের মহিলারা মসজিদে নামাজ পড়ে না বিধায় অনেক মহিলারা হেরেম শরীফে ওয়াক্তিয়া নামাজেও ভুল করে বসেন। নামাজের মধ্যে তিলাওয়াতে সিজদা অনেকেই ভুল করেন। অন্য মাযহাবের মহিলাদের বারবার তাকবির দেয়া, সিজদার ও বসার পদ্ধতি ভিন্নতা দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অন্যান্য ভুলভ্রান্তি তো আছেই। হজের সঠিক হুকুম আহকামগুলো জানার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বই হাজীদের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং হজের প্রশিক্ষণ মূলক ক্লাসগুলোতে অংশগ্রহণ করা উচিত। যে সকল মহিলা হজ সম্পর্কে ভাল জানেন তারা এলাকার মহিলাদের নিয়ে প্রশিক্ষণমূলক ক্লাস করতে পারেন। দোয়া কবুলের স্থানসমূহ ১৭টি দোয়ার নিয়ম, কোথায় কোন দোয়া পড়তে হবে। কি অনুসরণ করতে হবে, ইবাদতের নিয়ম পদ্ধতি, ঐতিহাসিক স্থানসমূহের বিবরণী, আচরণ বিধি ইত্যাদি সম্পর্কে ভালভাবে
জ্ঞানার্জন
করে নেয়া উচিত প্রয়োজনীয় দোয়াগুলো পড়ে ঝরঝরা বা সহজপাঠ্য করে নেয়া দরকার যাতে তাওয়াফ সায়ীর সময়েই বই দেখে দ্রুত পড়া যায় ।
হজের প্রয়োজনীয় সামগ্রীসমূহের তালিকা
মধ্যম সাইজের কুরআন শরীফ, তাফহীম খন্ড অজিফা, হাদিস খন্ড হজের নির্দেশিকা বই, ডায়েরি, কলম সাথে রাখবেন। ডায়েরিতে পাসপোর্ট নম্বর, হাজী নম্বর, ক্যাম্পের নম্বর, দেশের ঠিকানা সহ লিখে রাখবেন। পাসপোর্টের ফটোকটি পাসপোর্ট ও টাকা পয়সা রাখার ছোট বেল্টওয়ালা ১টি চামড়ার ব্যাগ, মহিলাগণ অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য সাদা কাপড়ের ছোট থলে বানিয়ে ফিতা দিয়ে কোমরের পেটিকোটে বা পায়জামার ফিতার সাথে বেঁধে রাখতে পারেন, বুকেও রাখতে পারেন। পেটিকোটে বড় পকেট বানিয়ে চেইন লাগিয়ে নিতে পারেন। পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আজকাল বায়তুল মোকাররমের অনেক দোকানেই হজের উপর বিভিন্ন রকম সেট কিনতে পাওয়া যায়। ট্র্যাভেল ব্যাগ, হ্রান্ডব্যাগ, ছোট হালকা ফোল্ডিং ব্যাগ (যাতে জুতা, সান্ডেল পানি ইত্যাদি সাথে রেখে সায়ী তাওয়াফ করতে সুবিধা হয়) হজ সফরে থাকা দরকার ।
মাথার তেল, চিরুনি, আয়না, ক্রিম, লোম, ভ্যাসলিন, ভিকস এলার্ম দেয়া ছোট টেবিল ঘড়ি, সুই সুতা, বিছানার চাদর ২টি এয়ারপিলো, জায়নামাজ, তাসবিহ, ২/৩ জোড়া স্যান্ডেল বা সম্ভব হলে কিছুটা চিনি ও লবণ, তোয়ালে, তায়াম্মুমের জন্য মাটির চাক, পানি, শীতের জন্য শাল বা সোয়েটার নিবেন।
পুরুষ ভাইয়েরা ইহরামের কাপড়, পায়াজামা পাঞ্জাবি, শার্ট-প্যান্ট লুঙ্গি, গেঞ্জি, আন্ডারওয়্যার, রুমাল, টুপি ইত্যাদি এবং মহিলা বোনেরা বোরকা, সালেয়ার কামিজ, ম্যাক্সি পরতে পারেন না তারা শাড়ি, ব্লাউজ নিবেন, তবে ব্লাউজ লম্বা বড় করে নিবেন, তবে ব্লাউজ লম্বা বড় করে, ফুলহাতা, ছোট গলার হতে হবে মাথার কালো ক্যাপ (এক ধরনের চুল ঢাকার টুপি) প্যান্টি, চুল বাঁধার রাবার ব্যান্ড ক্লিপ ইত্যাদি নিবেন ।
ওষুধপত্র
প্রাথমিক চিকিৎসা বা ফার্স্ট এইডবক্স সাথে রাখা উচিত । প্রত্যেককে অন্ততঃপক্ষে প্যারাসিট্যামল এন্টাসিড, হিস্টাসিন, এন্টিবায়োটিক, ডায়েরিয়ার, আমাশয়ের ফ্লাজিল বা এমোডিস, এন্টিসেপটিক ওয়েন্টেমেন্ট, তুলা সাথে রাখবেন। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, প্রেসার বা অন্য রোগীগণ অবশ্যই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলো নিতে ভুল করবেন না। পরিমাণে কিছুটা বেশি রাখতে প্রয়োজনে অন্যদের সহযোগিতাও করতে পারা যায়। ছোট খুচরা জিনিসগুলো একটি টিনের ছোট বা চকোলেট বা বিস্কুটের টিনে বা নিদেনপক্ষে আইসক্রিম বক্সে রাখতে সুবিধা হয়।
খাওয়া-দাওয়া
খাওয়া-দাওয়া যতদূর সম্ভব হাল্কা সাদাসিধে হওয়াই ভাল। প্রচুর পরিমাণ সাধারণ পানি, জমজমের পানি, প্রয়োজনে লবণমিশ্রিত পানি, ফল, জুস, ল্যাবন (এক ধরনের ঘোল), ট্যাং গ্লুকোজের শরবত খাবেন। সাথে খেজুর, বিস্কুট ফল রাখা ভাল ।
ইবাদত
হজ মূলত ৫ দিন ৮ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত। এর আগে পরেও কিছু ইবাদত রয়েছে। হজ শুধু আনুষ্ঠানিকতাই নয়। এর মাধ্যেমে পাওয়া যায় অনেক দুর্লভ ইবাদতের সুযোগ । যেমন ঃ মদিনায় গিয়ে রাসূল (সা)-এর রওজা মুবারক জিয়ারত সময় পেলে সময় পেলেও সম্ভব হলেও চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ রাসূল (সা) এর মসজিদে পড়া, জান্নাতুল বাকি জিয়ারত করা, ফরজ নামাজ প্রতি ওয়াক্ত মসজিদে পড়া, কাবাশরিফে এক রাকাত নামাজ অন্য মসজিদে ১ লাখ রাকাত এবং মদিনার মসজিদে ১ রাকাত নামাজ ৫০ হাজার রাকাত নামাজের সমমর্যাদার বলে রাসূল (সা) থেকে জানা যায়। এছাড়া তাহাজ্জুত, ইশরাক নফল নামাজ, জিকর, কুরআন তিলাওয়াত, বেশি বেশি করা দরকার। একাগ্রচিত্তে মনেপ্রাণ উজাড় করে নবী রাসূলগণের সাহাবাগণের স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহ যথা মুসলমানের কিবলা হযরত আবু বকর (রা), ওমর (রা), ওসমান (রা), আলী (রা)র স্মৃতি চিহ্ন, বদর, ওহুদ, খন্দকের প্রান্তর মসজিদে খামসা, হেরা ও সওর পর্বতসহ দর্শনীয় স্থান জেয়ারত করা উচিত। রাসূল (সা)-এর রওজায় আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে ইবাদত করা, কান্নাকাটি করা সমস্ত সমস্যার কথা বলা উচিত। রাসূল (সা) ও হযরত আবু বকর (রা), ওমর (রা) কে সালাম দেয়া উচিত। এখানে কেউ নিরাশ বা হতাশ হয় না আহার নিদ্রা কমিয়ে বেশি বেশি মসজিদে পড়ে থাকা ভাল। দোয়া কবুল হওয়ার স্থানগুলোতে আকুল হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা উচিত। ইবাদতের ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। শিরক বিদায়াত রিয়া যেন না হয়ে যায় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। এগুলোতে এমনিতেই কবিরা গুনাহ, হজের সময় তো আরও বেশি গুনাহ হবার সম্ভাবনা ।
দোয়ার নিয়ম
সূরা ফাতিহা, ইখলাস, এস্তেগফার দরুদ শরীফ ইত্যাদি পড়ে দোয়া কবুলের স্থানসমূহে কান্নাকাটি করে খাস দিলে দোয়া করবেন। আরবিতে যতগুলো দোয়া জানেন সেগুলো প্রথমে বলে নিতে হবে, অতঃপর বাংলায় মন উজাড় করে দোয়া করতে হবে। সর্বাপেক্ষা ভালো
দোয়া হলো, “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়াফিল আখিরাতে হাসানাতাঁও ওয়াকিনা আজাবান্নার” । মা বাবার, শ্বশুর- শাশুড়ি, দাদা-দাদী, নানা-নানী, অন্যান্য মুরুব্বী, ভাই-বোন, শিক্ষক, স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান পাড়া-প্রতিবেশী নাম মনে না থাকলে, যত দোয়াপ্রার্থী, হকদার আত্মীয়-স্বজন, দেশ দেশের কল্যাণ, বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য খাস দিলে দোয়া করা উচিত। স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের ও সন্তানের জন্য বা দুনিয়ার স্বার্থের জন্যই নয় বরং সকল মুসলমান, দেশ জাতি, আত্মীয়-স্বজনের এবং সফলতার জন্য দোয়া করা উচিত। উত্তম দোয়া হলো -দুনিয়ার হেদায়েত চাওয়া বা হেদায়েতের উপর টিকে থাকা এবং পরকালীন সাফল্য লাভের দোয়া ।
আচরণবিধি
মুসলমানরা, এক সময় উত্তম আচার আচরণের কারণে পৃথিবীর শিক্ষাগুরু ও সম্মানিত ছিল, কিন্তু আজও নিকৃষ্ট আচরণের কারণে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছে, হজ উত্তম আচরণ শিখার বিরাট সুযোগ এনে দেয়। সকলের সাথে বিশেষ করে কাফেলার অন্যান্য সঙ্গী সাথী এবং মক্কা মদিনাসহ ও অন্যান্য স্থানের হাজীগণের সাথে উত্তম আচরণ করতে হবে। অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা উচিত তাদের সাথে। উনারা আল্লাহর মেহমান। বিভিন্ন দেশের নানাবিধ আচার আচরণ বা নামাজের নিয়মকানুন, সিজদায় বসা ইত্যাদি দেখে কোনরূপ বিরূপ ধারণা বা মন্তব্য করা মোটেও ঠিক হবে না। এতে করে গুনাহ হবার সম্ভাবনা বেশি কারণ কার হজ কবুল হবে কেউ জানে না । আপনার আচরণ বা কথাবার্তায় কেউ যেন আহত না হয়। ঘটনাচক্রে কারও সাথে মনোমালিন্য হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ মিটিয়ে ফেলতে হবে মাফ চেয়ে নেয়া বেশি ভাল । সম্ভব হলে অসুস্থ, বৃদ্ধ, বিপদগ্রস্তদের যতটুকু সম্ভব সেবা ও সহযোগিতা করার চেষ্টা করা উচিত। যারা জ্ঞান রাখেন তারা সুযোগ পেলে ক্যাম্পের বা হোটেলের অন্যদের নিয়ে মাসয়ালা মাসায়েল তাফসির ও মুনাজাত করতে পারেন।
মহিলাদের ভিড়ের মধ্যে ঠেলা ঠেলি ধাক্কা-ধাক্কি করে কঙ্কর নিক্ষেপ, হাজরে আসওয়াদ চুম্বন, কাবাঘর স্পর্শ ইত্যাদি করা ঠিক নয়। কাবাঘর রাসূল (সা) এর রওজা মুবারক বা অন্য কোথাও ভাবের আতিশয্যে শিরক বিদায়াত যেন না হয় সেদিকে সতর্ক রাখতে হবে। এসব স্থানে বড়জোর চুম্বন করা যাবে। ও কপাল লাগানো যাবে না ।
জিয়ারত ও দর্শন
রাসূল (সা) এর রওজা মুবারক, জান্নাতুল বাকী, হামজা (রা) এর কবরসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক দর্শনীয় পবিত্র স্থানগুলো সকলের জিয়ারত করা এবং ঘুরে ঘুরে দেখা উচিত। রাসূল (সা) এর রওজা মুবারক এর সাথে হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত উমর (রা)-কেও সালাম দেয়া উচিত । মদীনার বদর, ওহুদ, খন্দক যুদ্ধের প্রান্তর, মসজিদে খামসা, মক্কায় জাবালে সওর, জাবালে নূর (হেরা গুহা), জান্নাতুল মুয়াল্লা, মসজিদে জিন ইত্যাদিসহ মসজিদে কুবা, মসজিদে কেবলাতাইন সহ বহু পবিত্র দর্শনীয় স্থান রয়েছে। ভাড়া করা গাড়িতে গেলে গাড়ি চালকই স্বেচ্ছায় সবকিছু চিনিয়ে থাকেন।
শপিং গিফট
হজ সফরে কেনা কাটা করা নাজায়েজ বা নিষিদ্ধ নয়, তবে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। হজ প্রক্রিয়া সম্পাদনের পরেই ধীরে সুস্থে কেনাকাটা করা ভাল। পছন্দ ও লিস্ট গিফটের জন্য তাসবিহ, জায়নামাজ, টুপি, আতর, সুরমা ভার লম্বা সাইজের খেজুর মিষ্টি তেঁতুল জয়তুনের মিসওয়াক ত্রিশ পারার কুরআন তিলাওয়াতের (ক্বারী বাসেত বা ক্বাবা শরীফের ইমামের) ক্যাসেট বা সিডি, বিভিন্ন সূরা (নামাজেরগুলো), দোয়া আজান সংবলিত ব্রিফকেস সাইজের টেপ রেকর্ডার উঠতি বয়সের বাচ্চাদের মুখস্থ, পৌনে তিন হাত বহরের হিজাব বা স্কার্ফ, হাজী সাদা রুমাল, বোরকা, বড় জায়নামাজ (২/৩ জন একসাথে নামাজ পড়তে পারে এমন), ক্বাবা শরীফ, মদীনা শরীফের শো-পিস্ ইত্যাদি নিতে পারেন। নিকটস্থ মহিলা আত্মীয়-প্রতিবেশী বা বান্ধবীকে বড় স্কার্ফ বা বোরকা দিলে যারা আগে ব্যবহার করতেন না তারা হয়তো হজের ও মক্কা মদীনার ভয় বা সম্মান স্বরূপ ব্যবহার করতেন, এ রকম বহু নজির রয়েছে। টেপ রেকর্ডারে ধর্মীয় বই সিডিগুলো ছোটদের বড়দের উপকারে আসবে এরসাথে নিঃসন্দেহে সওয়াবও পাওয়া যাবে।
হজ পরবর্তী করণীয়
অনেকে হজ করে এসে ৪০ দিন বেশ ভালভাবে শরীয়তের বিধান মেনে চলেন, নামাজ দোয়া ভালভাবেই করেন। কিন্তু ৪০ দিন পর মনে হয় যেন শরীয়তের বিধি নিষেধ, হুকুম আহকামের রশি গলা থেকে খুলে একেবারেই ফ্রি হয়ে যান। মহিলাদের বেলায় মাথার কাপড় পরে যায়। পুরুষদের চুল ইতোমধ্যে কিছুটা বড় হয়ে যায়, তাই টুপিরও প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। (অবশ্য এটা ফরজ নয়), নামাজ কালামে খামখেয়ালি ভাব এসে যায়। আত্মীয় -স্বজন বন্ধু বান্ধবেরা ২/৪ বার হুজুর বা মোল্লা বললে তো কথাই নেই। কিছু হাজীদের দেখলে তো বোঝারই উপায় নেই যে তারা জীবনে কখনও হজ ব্রত পালন করেছিলেন কিনা? এ ধরনের আচরণ একেবারে ঠিক নয়। যিনি বা যারা এধরণের মন্তব্য করেন তারা মস্তবড় ভুল করেন, তাদের উচিত পুরাতন অনৈসলামিক জীবন ত্যাগ করে নতুন ইসলামী জীবন ত্যাগ করে নতুন ইসলামী জীবন গ্রহণ করার জন্য একজন সদ্য হাজীকে congratulate করা, সম্মান করা। সেটা না করে অন্য লোকেরা হজ পরবর্তী গুনাহগুলো অহেতুক স্বীয় কাঁধে তুলে নেওয়া হচ্ছে, এটা করা কি ঠিক হচ্ছে? হাজী সাহেবানদেরও মজবুত ঈমানদার হওয়া উচিত। ইসলামী জীবন-যাপন গ্রহণের সঠিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে স্বীয় সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারলে একদিন মন্তব্যকারীও লজ্জা পেয়ে সে নিজেও হজ করতে যেতে পারে। অপরদিকে আল্লাহর চেয়ে বান্দাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া ঠিক নয়। একটু চিন্তা করে দেখুন হজ সকলের নসিব হয়? কেউ আর্থিক কেউ শারীরিক কেউ সামাজিক কেউ নৈতিকভাবে ঐতিহাসিক স্থানগুলো জিয়ারতের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত। অনেকে হাজীদের মাধ্যেমে রাসূল (সা) এর রওজায় সালাম পাঠান, দোয়া চান পবিত্র হজব্রতে যেতে না পাড়ায় বেদনায় নীরবে কেঁধে বুক ভাসান। আল্লাহপাক যাদের সমর্থ দিয়েছেন তাদের পবিত্র হজকে সবিশেষ গুরুত্ব ও সম্মান দেয়া উচিত একজন সদ্য হাজী হজ থেকে ফিরে আসার পর আত্মীয় -স্বজন, বন্ধু- বান্ধব, প্রতিবেশী তার সাথে দেখা করতে, দোয়া নিতে আসেন। বিরক্ত না হয়ে সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সমন্বয়ে হজের অনুভূতি ও শিক্ষা ও ঘটনাপ্রবাহ আবেগের সাথে বণর্না করত তাদের কে হজে যেতে উদ্ধুদ্ধ করা উচিত। প্রয়োজনে একটা টি পার্টি তথা গেট টুগেদার করে এক সাথে বসলে ব্যাপারটা অধিকতর সহজ ও সুন্দর হয়।
বর্তমান দ্বিধা বিভক্ত মুসলিম বিশ্বের সঙ্কটকালীন সময়ে হজ আমাদের জন্য মুসলিম চেতনায় জাগ্রত হতে ও সমস্যা সমাধানের এক বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয় বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আসুন হজের মধ্যমে আল্লাহপাক সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ ভাব বিনিময়, বাবা আদম (আ), ইব্রাহীম (আ) থেকে শুরু করে রাসূল (সা) পর্যন্ত বহু নবী-রাসূল ও সাহাবাগণের স্মৃতিবিজরিত, অতিপবিত্র ইসলামের জন্মভূমি দেখার যে সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন, তা দেখে আমরা প্রত্যেক সমর্থবান মুসলমান যেন নিজেদের ধন্য করি। আপনাকে আপনিই খুঁজে বের করার চেষ্টা করি । স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে চেনার চেষ্টা করি। “ আর প্রকৃতক্ষে জ্ঞানী (বুদ্ধিমান) লোকেরাই কোন বিষয় থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে (সূরা আল ইমরান -৭)” আল্লাহপাক প্রত্যেক সমর্থবান মুসলমানকে মকবুল হজ করার তৌফিক দিন। আমিন, সুম্মা আমিন।
- ১৯৯৮ সালে প্রথমবার হজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা ।