Darsul Hadis: জিলহজ আমলের অবারিত সুযোগের মাস

মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ২৯ মে ২০২১

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ : "مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهَا أَحَبُّ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ- يَعْنِىْ أَيَّامَ الْعَشْرِ-". قَالَ : قَالُوْا : يَا رَسُوْلَ اللهِ، وَلا الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ؟ قَالَ : "وَلا الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ، إِلا رَجُلًا خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ، ثُمَّ لَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذٰلِكَ بِشَيْءٍ".

ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন: জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন নেক আমল করার ন্যায় অন্য কোনো দিনের আমল মহান আল্লাহর কাছে এত প্রিয় নয়। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন, হে মহান আল্লাহর রাসূল সা. মহান আল্লাহর পথে জিহাদও কি এ দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে মহান আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয় নয়? তিনি বলেন, মহান আল্লাহর পথে জিহাদও বেশি প্রিয় নয়; তবে ঐ ব্যক্তি ছাড়া, যে ব্যক্তি নিজের জীবন ও সম্পদ নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে গেল এবং তা হতে কোনো কিছুই আর ফিরে এলো না। (বুখারী-৯৬৯; মুসনাদে আহমাদ-৩১৩৯)

রাবি পরিচিতি

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. নবী কারিম সা.-এর চাচাতো ভাই। নবী কারিম সা.-এর প্রিয়জন, বাল্যবন্ধু আপন চাচা হজরত আব্বাস রা.-এর সন্তান। তার মাতা লুবাবা বিনতে হারিস। তার বোন উম্মুল মুমেনিন হজরত মায়মুনা রা.। হিজরতের তিন বছর আগেই তিনি জন্মলাভ করেন। নবী কারিম সা. যখন ওফাতবরণ করেন তখন তিনি তেরো বছরের বালক। মহানবী সা. তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন : اَللّٰهُمَّ فَقِّمْهُ فِىْ الدِّيْنِ وَعَلِّمْهُ التَّأ وِيْلَ. “হে আল্লাহ! তুমি তাঁকে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে বিশেষ বুঝ দাও এবং তাকে নিগূঢ় বিশ্লেষণ শিক্ষা দাও।”

হাদীসের ব্যাখ্যা

"مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهَاأَحَبُّ إِلَى اللهِ عَزَّوَجَلَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ – يَعْنِىْ أَيَّامَ الْعَشْرِ -".

“জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন নেক আমল করার চেয়ে অন্যকোন দিনের আমল মহান আল্লাহর কাছে এত প্রিয় নয়।”

আল্লাহ তায়ালার কাছে আমলে সালিহ করার জিলহজ মাসের প্রথম দশটি দিন সর্বাধিক প্রিয়। যদিও এ বিষয়ে আমরা সম্যক অবগত নই। বিধায় আমরা অন্যান্য সময়ের মতই এই দিনগুলোকেও অবহেলায় নষ্ট করে থাকি। আমলে সালিহ সঠিক নিয়মে সঠিক সময়ে করার মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়। জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন আমলে সালিহর জন্য সবচেয়ে মোক্ষম ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে আল্লাহ তায়ালার সমুদয় ইবাদত সম্পাদিত হয়। যেমন- সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ, দান-খায়রাত, কুরবানি, যিকির-আযকার এবং অন্যান্য সৎ আমলসমূহ।

জিলহজ মাসের প্রথম দশকে নেক আমলের ফযিলত

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করার মতো প্রিয় আল্লাহ্র কাছে আর কোনো আমল নেই।’ তারা প্রশ্ন করেছেন হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করা কি এর চেয়ে প্রিয় নয়? রাসূল সা. বলেছেন, ‘না, আল্লাহ্র পথে জিহাদও নয়। কিন্তু সে ব্যক্তির কথা আলাদা যে তার প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহ্র পথে জিহাদে বের হয়ে যায় এরপর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে আসে না।’ (আবু দাউদ-২৪৪০)

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে যেসব নেক আমল করা যেতে পারে

১. আল্লাহ তায়ালার যিকির করা

এ দিনসমূহে অন্যান্য আমলের মাঝে যিকিরের এক বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা. বলেছেন, এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রিয় ও মহান কোনো আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ বেশি করে আদায় কর। (মুসনাদে আহমদ-৬১৫৪)

২. উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা

এ দিনগুলোতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মহত্ত্ব ও বড়ত্ব ঘোষণার উদ্দেশ্যে তাকবির, তাহমিদ, তাহলিল ও তাসবিহ পাঠ করা সুন্নাত। তাকবির প্রকাশ্যে মসজিদ, বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, বাজারসহ সর্বস্থানে পাঠ করা হবে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ও আবু হুরায়রা রা. জিলহজ মাসের প্রথম দশকে বাজারে যেতেন ও উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করতেন, লোকজনও তাঁদের অনুসরণ করে তাকবির পাঠ করতেন। (বুখারী-৯৬৯)

জিলহজ মাসের প্রথম দশকের দিনগুলোতে পঠনীয় তাকবির হচ্ছে- اَللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ وَلِلّٰهِ الْحَمْدُ

৩. সিয়াম পালন করা

জিলহজ মাসের প্রথম নয় দিনে সিয়াম পালন করা মুসলিমের জন্য উত্তম। কারণ, নবী করিম সা. এ দিনগুলোতে নেক আমল করার জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। উত্তম সব আমলের মধ্যে সাওম অন্যতম।

৪. নিয়মিত ফরজ ও ওয়াজিব সমূহ আদায়ে যত্নবান হওয়া

ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ সময়মতো সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে আদায় করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার বান্দার ফরয ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় কোনো ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্যলাভ করতে পারে না। আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারাই সর্বদা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। (বুখারী-৬৫০২)

৫. খাঁটি মনে তাওবা করা

যেহেতু এ মাসের মর্যাদা অনেক তাই এ মাসে খাঁটি মনে তাওবা করা উচিত। আল্লাহ বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র কাছে তওবা কর বিশুদ্ধ তওবা।” (সূরা তাহরিম: ৮)

৬. হজ ও ওমরাহ আদায় করা

হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, “মানুষের মাঝে যাদের সেখানে যাবার সামর্থ্য রয়েছে, আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সে ঘরের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য।” (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)

৭. ঈদের সালাত আদায় করা

রাসূলুল্লাহ সা. ঈদের সালাত গুরুত্ব দিয়ে আদায় করেছেন। কোনো ঈদে সালাত পরিত্যাগ করেননি। বরং তিনি মহিলাদেরকেও এ সালাতে অংশ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

৮. কুরবানি করা

এ দিনগুলোর দশম দিন সামর্থ্যবান ব্যক্তির কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। আল্লাহ বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ “আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন ও কুরবানি করুন।” (সূরা কাওসার : ২)

কুরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ। জিলহজের দশম তারিখে সুনির্দিষ্ট পশুর রক্ত প্রবাহিত করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টাস্বরূপ তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করা।

হাদীসের শিক্ষা

১. জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের তুলনায় বছরের অন্য কোনো দিনের আমল এত মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ নয়।

২. এ মাসের প্রথম দশ দিনের আমলে অবহেলা ও শৈথিল্য দেখানো কাম্য নয়।

৩. জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের নফল সিয়াম, তাহাজ্জুদ সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, মহান আল্লাহর যিকির ও অন্যান্য সৎ আমলে অগ্রণী হওয়া উচিত। ৪. এ মাসের ১০ তারিখে কুরবানি করতে হয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা এ দিনে ঈদের সালাতের পর পশু কুরবানি করবে।

লেখক : প্রভাষক, সিটি মডেল কলেজ, ঢাকা